প্রাণের উৎসব জাওয়া _করম | Festival of Life Jawa-Karam
ভাদ্র মাসের শুক্লা একাদশী বা পার্শ্ব একাদশীতে সমাজে পালিত একটি উৎসব হলো করম।
টুসু, ভাদু, বাঁদনা, জিতা, ছাতা, আখান, সারহল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হলেও প্রাচীনত্বের দিক থেকে জাওয়া বা করমের একটি ভিন্ন তাৎপর্য রয়েছে।
এটিকে বলা যায় আদিম জনগোষ্ঠীর ধারক ও বাহক। এর মধ্যে অন্যতম কুড়মি, সাঁওতাল, ভূমিজ, মুন্ডা, ওঁরাও, কামার, কুমার, রাজোয়াড়, ডোম, ঘাসি প্রভৃতি হড়মিতান জনগোষ্ঠী। তবে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় কুড়মি সমাজের মধ্যে এর স্বীকৃতি, মান্যতা ও ব্যপকতা।
আদিবাসীদের “করম” পূজা পরিবেশ শিক্ষার পাঠ দেয় ।।
এই উৎসবের বিশেষ তাৎপর্য একটি বাঁশের টকি বা ডালাতে বালি ভর্তি করে তাতে নানা ধরনের বীজ পুঁতে তার থেকে অঙ্কুরোদগম ও উদ্ভিদের সৃষ্টি রহস্য উন্মোচন। এই উৎসবটিকে আমরা কৃষি আবিষ্কারের উৎসব বা অরণ্য থেকে কৃষি সভ্যতায় উত্তরণের উৎসব হিসাবে গণ্য করতে পারি। এখানে জাওয়া বা করম শব্দের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন রয়েছে। জাওয়া শব্দটি এসেছে কুড়মালি জওয়া (পুনর্জনম) শব্দ থেকে। অর্থাৎ এর অর্থ হলো জনম বা জন্ম বা Germination।
এটি অবশ্যই একটি মহোৎসব। অঙ্কুরোদগমের আয়োজন জাওয়া ডালিতে। এটি সন্তান ভাবনারও অঙ্গ। সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মানুষ একে কারাম, জাওয়া কারাম, ইদ কারাম বলে থাকেন। কোন কোন স্থানে করমা বলা হয়ে থাকে। আজও কুড়মি ঘরে সন্তান জন্ম হলে বলা হয় জাওয়া জনম। এই শব্দটির সমার্থক বাচক শব্দ হিসাবে পাওয়া যায়— জি, জি, জিয়ত, জওআ, জিউ, জবি, জিআ, জুআন, জ। এখানে জাওয়া অর্থে বীজ থেকে অঙ্কুরোদগম বা উদ্ভিদের জন্ম। আর করম শব্দের অর্থ কর্ম বা কাজ। আদিম জনগোষ্ঠী সকলেই প্রকৃতির পূজারী। এই উৎসবের পূজানুষ্ঠান ও পালনবিধি লক্ষ্য করলে দেখা যায় এটি বৃক্ষ পুজার অনুষ্ঠান। বৃক্ষকে জীবন্ত আত্মার অধিকারী হিসাবে স্বীকার করে এবং ওকে কেন্দ্র করে বিশ্বাস-সংস্কার, আচার-অনুষ্ঠানের এক বিস্ময়কর সমাবেশ ঘটায় সাধারণ মানুষ। বৃক্ষে the inherent soul and of the embodied spirit বা অন্তর্গত আত্মা এবং সাকার জীবের অস্তিত্বের লোকবিশ্বাসের মাধ্যমে এ পূজার গতি অবিরত বলে মনে হয়।
আদিম মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল-
সন্তান ও উর্বরতা। তাদের ভাবনা এই যে সৃষ্টি রহস্য এর পিছনে সূর্য অর্থাৎ সিংরোঙার ভূমিকা আছে।
তাই তাদের প্রধান দেবতা হলো অগ্নি, সূর্য, জল, বৃক্ষ, বড় পাহাড়, লিঙ্গ, যোনি। হরপ্পা সভ্যতাতেও শিলমোহর নারীর যোনি থেকে উদ্ভিদের উদ্ভব বিষয়টি অবশ্যই বিশে তাৎপর্য বহন করে। সুমেরিয় সভ্যতাতে চন্দ্র বা সূর্য দেবতাকে বলা হতো 'জিঅ'। কুড়মিরা শিবকে বলে থাকেন পশুপতি নাথ, বড়পাহাড় বা জিউ। তাদের বিশ্বাস সমাজে ব্যাপক ভাবে কৃষির প্রচলন করেন শিব। রামেশ্বর ভট্টাচার্যের 'শিব-সংকীর্তনে আমরা এই চিত্র দেখতে পাই। তাই বলতে পারি জাওয়া বা করম উৎসব আনুমানিক ১০ হাজার বছরের পুরানো এবং এই আবিষ্কারের কৃতিত্ব অবশ্যই উক্ত জনগোষ্ঠী গুলি তবে পৃথিবীর আর কোন দেশে কোন জনগোষ্ঠী এমনতর কৃষি উৎসব পালন করেছিলেন তা আজও আমাদের জানা নেই। করম উৎসব মূলত তিনটি উৎসবের মিশ্রণ—জাওয়া উৎসব, করম একাদর্শী ও ঈদ পরব। এই তিনটি উৎসব এমনভাবে এখানে জড়িত যাতে বাইরে থেকে একটি উৎসব বলে মনে হয়।
পূজা পদ্ধতি ঃ করম অর্থ
এই উৎসবের সাথে জড়িত রয়েছে একাদশী ব্রতের সার্বজনীন উদ্দেশ্য। কুমারী তথা অন্যরাও এই ব্রত পালন করার সঙ্গে সঙ্গে একাদশী ব্রত পালন করেন এবং জঙ্গলে গিয়ে পান, হরিতকি, বহুড়া, বেল, কেঁওড়া গাছ ও পূজার অন্য আবশ্যক ফুল ও পাতা তুলে আনেন। এক নির্দিষ্ট সময় ধরে সন্ধ্যাবেলায় পূজানুষ্ঠান পালিত হয়। পূজা পালনের আগে সমস্ত ব্রতীগণ স্নান করতে যান। সূর্যাস্তের লগ্নেই স্নান ক্রিয়াদি সুসম্পন্ন করে নদী বা পুকুরের ঘাটে সূর্য দেবকে ঝিঙা পাতায় হলুদ, তেল ও দাঁতন কাঠি অর্পণ করা হয়। এই অনুষ্ঠান হলো তেল শিয়ারী অনুষ্ঠান।
পূজার জন্য নির্দিষ্ট স্থান সাজানোর কাজ শেষ করে ব্রতীদের মধ্যে একজন অন্যদের সাথে মাদলের তালে তালে করম গাছের ডাল আনতে যায়। গাছের সামনে গিয়ে গাছের গোড়াটাকে ভালো ভাবে পরিষ্কার করে, গোবর জল দিয়ে জায়গাটিকে পবিত্র করে পূর্ব দিকে মুখ করে বৃক্ষদেবের পূজা করে। পূজা শেষে গাছ থেকে দুটি ডাল কেটে কাঁধে করে নিয়ে আসার পথে সমস্ত মানুষ একসাথে মাদলের তালে তালে হরিবোল। তথা করম ঠাকুরের স্তুতিমূলক গান করতে করতে পূজা মন্ডপের দিকে আসে। মুখার এই গানটি সর্বত্র গাওয়া হয়-
করম পূজা ঝুমুর গান
"আজরে করম রাজা ঘরে দুয়ারে, কালরে করম রাজা কাশ নদীর পারে"
এই ডাল দুটি পূজা মন্ডপে নিয়ে এসে স্থাপন করা হয়। সমস্ত ব্রতীরা ঘি এবং প্রদীপ জ্বালিয়ে আবশ্যকীয় পূজা সরঞ্জাম নিয়ে মন্ডপের চারপাশে বসে। অন্যান্য পূজা সামগ্রীর সঙ্গে একটা করে কাকুড় বা শসা সকলেই নিয়ে আসে যা বেটা বা পুত্র সন্তান বলে পরিচিত। এই পূজা সরঞ্জামের মধ্যে বেটাই মুখ্য ভূমিকা। যে হলো ব্রতী বা পূজারিণীর সন্তানের প্রতীক। আবার কেউ কেউ বলেন শশা আসলে পুরুষাঙ্গের প্রতীক। অন্যান্য পূজা সরঞ্জামের মধ্যে থাকে মাটির প্রদীপ, সলতে, প্রদীপ জ্বালানোর জন্য ঘি বা তেল, শাল পাতার তৈরি থালায় নদীর বালি, স্নানের পর পুকুর থেকে আনা জল, দুধ, চালের গুঁড়ি, সিঁদুর, চিড়ে, গুড়, মিঠাই ইত্যাদি।
সমস্ত ব্রতী উপস্থিত হওয়ার পর মুখ্য ব্রতী অর্থাৎ যে করম গাছের ডাল নিয়ে আসে, গ্রামের মোড়লের নির্দেশে পূজা কার্যাদি সুসম্পন্ন করে, তার সাথে জাওয়া ডালি প্রস্তুতকারী উপোসিনী ব্রতীরাও সামিল হন। পূজাশেষে একজন মুখ্য ব্যক্তির মুখ দিয়ে ব্রতীরা তথা অন্যান্য আগত আবালবৃদ্ধবণিতা সকলেই একমনে করমব্রত উপাখ্যানটি শ্রবণ করে। অনেক স্থানে করমব্রত কথা পাঠ করা হয়।
করম ব্রতের কথা :
ব্রত কথাটি অন্যান্য ব্রত কথার মত। এখানে করম ঠাকুরের মহিমা তথা কতকগুলি লৌকিক এবং শুদ্ধ আচার-আচরণ সম্পর্কে সচেতনতা আনার জন্য উদ্দিষ্ট। ব্রত কথাটি সংক্ষেপে নিম্নে বর্ণিত হলো—
এক সন্তানহীন পিতামাতা করম ঠাকুরের পূজা করে করম ঠাকুরের কৃপায় কর্ম ও ধর্ম নামে দুই পুত্রসন্তান লাভ করেন। তাই কর্ম ও ধর্ম দু'জনেই করম ঠাকুরের পূজা করতে আরম্ভ করে। কর্ম ব্যবসা সামাল দেয়, আর ধর্ম বেচারা চাষাবাসের কাজে ব্যস্ত থাকে। এক পার্শ্ব একাদশীর দিন কর্ম নিজের ব্যবসা থেকে ফেরার খবর ধর্মর কাছে পাঠায়। কিন্তু ভক্তপ্রাণ ধর্ম করম ঠাকুরের পূজায় ব্যস্ত থাকায় কর্মকে আনার জন্য যেতে পারে না। কর্ম নিজের ধন সম্পত্তির গর্বে গর্বিত, তাই ধর্মর উপর রাগ করে করম ঠাকুরের অবমাননা করে।
করম ঠাকুরের অবমাননাই শুধু করল না। পূজা মণ্ডপ থেকে করম ডালকে উৎখাত করে ফেলে দেয়। নিজে করম পূজা করে পালনের (পারণের) জন্য বাসিভাতের বদলে গরম ভাতের পালন (পারণ) করে। এর ফল ভালো হয়নি, দেবতার রোষ গিয়ে পড়ে কর্মুর উপর।
কর্মকে দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করতে যেমন হলো তেমনি অনেক রকম কষ্টের সম্মুখীন হতে হলো। অবশেষে নিজের ভুল বুঝতে পারল এবং ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে করম ঠাকুরকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে বহু কষ্ট স্বীকার করে সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে ঠাকুরের কাছে যায়। কিন্তু ঠাকুরের কাছে পৌঁছানোর পূর্ব মুহূর্তে সমুদ্রের ভেতর এক কুমীর পথ আটকে বসে।
কুমীরের সঙ্গে সন্ধি করে করম ঠাকুরের রাজ্যে পৌঁছানোর জন্য অনুরোধ জানায় কর্ম। কুমীর সত্য রক্ষার জন্য মহিমা প্রচারের উদ্দেশ্যে নিজের পিঠের উপর চড়িয়ে করম ঠাকুরের পাশে পৌঁছে দেয়। কর্ম ঠাকুরের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। ভক্তবৎসল ঠাকুর ক্ষমা করার সঙ্গে অভয় বর প্রদান করেন এবং মোক্ষ প্রাপ্তির জন্য আশীর্বাদও করেন।
সংক্ষেপে এটাই করম ঠাকুরের ব্রত কথা।
: জাওয়া দুই প্রকারের হয়— সাঁচি জাওয়া ও সাধারণ জাওয়া। নয় বছর বয়সের নীচে এমন মেয়ের দল যে জাওয়া পাতে তা হলো সাঁচি জাওয়া আর দশ বা তার বেশি। বয়সের দল যে জাওয়া তোলে তা সাধারণ জাওয়া বলে গণ্য করা হয়। তবে জাওয়া তোলার ক্ষেত্রে অবশ্যই কুমারী মেয়ে হতে হবে। সাঁচি জাওয়ার বিশেষত্ব হলো বড় বা রজঃস্বলা প্রাপ্ত মেয়েরা এই জাওয়া ছুঁতে পারে না। অত্যন্ত পবিত্রতার সাথে ও সতর্কতার সাথে এই জাওয়া গুলি রাখা হয়। এই উৎসবটি সাধারণত তিনটি ভাগ— সঙ্গত, উপবাস, পান্না।
সাধারণত দ্বিতীয় দিনকে বিশ্রাম হিসেবে মানা হয়, সেদিন কোন নাচ গান হয় না। কিন্তু সব জায়গায় এই নিয়ম নাই। তৃতীয় দিন থেকে প্রতিদিন ভোরে সূর্য উদয়ের সময় এবং সূর্যাস্তের পর জাওয়া ডালাগুলি আখড়াতে নিয়ে গিয়ে গোলাকারে রেখে জাওয়া বা করম গান গেয়ে নাচ করা হয়। তিন দিন বা চার দিনের মধ্যে অঙ্কুরোদগমের সূচনা হয়। তখন এগুলিকে বলা হয় জাওয়া। মেয়েদের মধ্যে শুরু হয় জাওয়াগুলিকে সন্তান স্নেহে লালন পালন। মাতৃভাব জেগে উঠে তাদের মনে। তাদের বলাও হয় জাওয়ার মাঞ। তখন থেকে তাদের বলা হয় করমতি, কারমাটি বা পরবতি। এই সময় জাওয়ার বেড়ে উঠা, সুস্থতা ও মঙ্গল কামনায় তারা নানান ব্রত ও বিধি নিষেধ মেনে চলে। এই কদিন তারা নুন খাবে না। লোক বিশ্বাস-নুন খেলে চারা গলে যায়। 'হাবুচুল্লা' বা চিৎ হয়ে পুকুরে স্নান নিষিদ্ধ, তাতে করে জাওয়াগুলি চুলের মত চলে পড়ে।
মাটিতে মলত্যাগ নিষিদ্ধ, তাহলে 'ভুসকা লাগার ভয়। চুলে চিরুনী দেওয়া নিষিদ্ধ চুল ঝরে গেলে করম ঠাকুরের মুখে পড়ে। গুড় খেলে পিঁপড়ে লাগে, ঘোল খাওয়া বারণ, তাহলে নাকি চারাতে ছাতি লাগে এবং চারা নষ্ট হয়, এমনতর লোকবিশ্বাস রয়েছে। বিশ্বাসের বৈজ্ঞানিক সত্যতা না থাক কিন্তু মাতৃহৃদয়ের যে প্রকাশ, চারা বা উদ্ভিদকে সন্তান ভাবার যে শিক্ষা, তাকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না।
এছাড়া করম আবার অনেক রকম হয়। যেমন- মাঝি কারাম, ভাঙ্গুয়া কারাম, গুরু
কারাম, চেলা কারাম, মরা কারাম।
মাঝি কারাম :
মাঝি কারাম যেহেতু গ্রামপ্রধান পরিচালনা করেন, সেই জন্য এই কারান বেশি জনপ্রিয় এবং সর্বজনীন। গ্রাম জাত নির্বিশেষে সবাই একাত্ম হয়ে যায় এই কারামে। এই কারামকে 'জাওয়া কারাম'ও বলা হয়। প্রতি বৎসর এই কারাম উদ্যাপিত ডাঙ্গুয়া কারাম ভাঙ্গুয়া মানে অবিবাহিত।
যখন গ্রামের ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে বিয়ের উপযুক্ত হয়, তখন তাদের উদ্দেশ্যে ডাঙ্গুয়া কারাম অনুষ্ঠিত হয়। পাঁচ বৎসরে একবার। তবে এ কারাম যে পালন করতেই হবে সেরকম ধরাবাঁধা নিয়ম নেই।
আজকাল আর হয় না।
গুরু কারাম :
শিষ্যরা গুরুর কাছে বিদ্যাশিক্ষা আরম্ভ করার পূর্বে এই কারাম অনুষ্ঠিত হয়। চেলা কারাম : গুরুর কাছে বিদ্যাশিক্ষা শেষ হয়ে গেলে চেলা কারাম অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে শুরু কারাম ও চেলা কারাম প্রায় উঠেই গেছে।
মরা কারাম ঃ
কোন লোকের মৃত্যু হলে তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত হয়। যার বাড়ীর লোক মারা যাবে তাকেই ব্যবস্থা করতে হবে এরকম নিয়ম নেই। মৃত ব্যক্তি যদি কারাম শুরু হয় কিংবা ধনী পরিবার তবেই এ কারাম উদযাপিত হয়।
- করম পূজা মানে কি?
- কারাম উৎসব কি?
- করম পূজা কেন পালন করা হয়?
- করম পূজা কি পশ্চিমবঙ্গের ছুটি?