টুসু গান মূলত কোন জেলায় প্রচলিত আছে?
দক্ষিণ পশ্চিম সীমান্ত বাংলার জনপ্রিয় কৃষি উৎসব টুসু। গ্রামবাংলার প্রাণ-স্পন্দনের স্বাতন্ত্র্যমন্ডিত গান কেন্দ্রিক উৎসব। গানই এর প্রাণ। গানের মধ্য দিয়ে উৎসবের আহ্বান-বিসর্জন। ভৌগোলিক পরিবেশ অনুসারে প্রাচীন রাঢ়দেশই ছিল টুসুর আবাসস্থল। রাজনৈতিক কারণে রাঢ় দেশ দুই ভাগে বিভক্ত হয়- বাংলা ও বিহার। ফলে টুসুর অঞ্চল বিভক্ত হয়ে পড়ে। বাংলা ও বিহারের মধ্যবর্তী জেলাগুলিতে টুসুর আধিপত্য বেশি। বিহারের রাঁচি, হাজারিবাগ (বর্তমানে ঝাড়খন্ড) বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শুরু করে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ছেড়ে টুসু তার সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে মেদিনীপুরে। বর্তমানে উত্তর, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার বাগদা, সন্দেশখালি, বর্তমান ঝাড়খন্ড, পূর্বতন বিহারের পছঘাট, মুসাবনি, জয়দা, বুভু, তামাড় প্রভৃতি অঞ্চলে আড়ম্বর ও উল্লাসের সাথে টুসুর পরব পালন করা হয়ে থকে। এককথায় বলা যায়, বন, পাহাড়, ঝর্ণা, পাহাড়ি নদীর চড়াই উত্তাই—এই হলো টুসুর ভুবন।
সমগ্র পৌষমাস উৎসবের মাস। এই সময় আমন ধান কাটার পালা। অর্থাৎ ঘরভর্তি শস্য। পেটে থাকে না খিদের জ্বালা। হাতে থাকে অখন্ড সময়। এই সময় মানুষ একটু উৎসবের আয়োজন করবেই। তাই অঘ্রাণ সংক্রান্তির পরদিন অর্থাৎ পৌষের প্রথমদিন টুসুর প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিদিন সন্ধ্যাকালে গানের মাধ্যমে টুসুর বন্দনা ও জাগরণ হয়। এইভাবে চলতে থাকে সমগ্র মাস। মাসের শেষ দিনগুলিতে জমে উঠে পরব সংক্রান্তির দিন পরবের মূল আকর্ষণ। সারারাত জেগে গান গেয়ে টুসুকে জাগানো হয়। এই রীতিকে টুসুর জাগ্রন বা জাগরণ বলে। সারারাত্রি জাগরণের পর ভোরবেলায় অনুষ্ঠিত হয় টুসু ভাসানের পালা। শীতের হাড় কাঁপানো ঠান্ডা আর নারী কন্ঠের কান্নাকে সঙ্গে নিয়ে সামনে নদী বা পুষ্করিণীতে টুসু বিসর্জন দেওয়া হয়।
টুসুর নামকরণ :
অগ্রহায়ণ মাসের সংক্রান্তি থেকে পৌষ সংক্রান্তি পুরো একটি মাস ধরে চলে টুসু পুজো। টুসু পরবের গোড়ার কথা বলতে গিয়ে নানা মুনির নানা মত।
কেউ কেউ একে বলেছেন, সার মাটি দিয়ে ক্ষেত্র উর্বর করার প্রতীক হচ্ছে 'টুসু'। আমাদের আলোচনার বিষয় টুসুর নামকরণটি কীভাবে হলো। তুযু না টুসু কোন্ নামটি ঠিক এই নিয়ে নানা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত বাংলায় 'টুসু' নামের প্রচলন বেশি। এছাড়া সমগ্র ছোটনাগপুর অঞ্চল সন্নিহিত গ্রামগুলিতে টুসু ব্যবহৃত হয়। বাঁকুড়া ও বীরভূমের কিছু কিছু গ্রামে 'তুবু' উচ্চারণ আছে, তবে 'টুসু' উচ্চারণটি সামগ্রিক। 'তুমু' থেকে টুসু' এখানে দস্তা বর্ণ আসলে মূর্ধণ্য বর্ণে পরিণত হয়েছে বলে মনে হয়। ভাষাতত্ত্বের নিয়মে এমন হওয়ার পিছনে কোন বিরোধ নেই। ভারতকোষে ‘টুসু' শব্দটি রয়েছে। এই নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন। লোকসাহিত্য রসিক সমস্ত পণ্ডিত মানুষ পশ্চিমবঙ্গের ‘তুষ তুষলী' বা ‘তোষলা’ ব্রতটিকে তুষু বলে উল্লেখ করেছেন। আবার অনেকেই তুষুর উচ্চারণ টুসু' বলে মানভূম তথা পুরুলিয়ায় পরিচিত বলে মনে করেন।
টুসুর লোককাহিনি বৃহৎ মানভূমে টুসু সম্পর্কিত একটি লোককাহিনি রয়েছে। তবে লোককাহিনিটি যে বহুল প্রচলিত নয় বলে এগুলির মৌলিকতা সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ আছে। লোককাহিনিটি হল-
কুর্মী সমাজে এক সুন্দরী কন্যার ডাক নাম টুসু, ভালো নাম রুক্মিনী।
কন্যাটি রূপে গুণে লক্ষ্মীর মতো। এক কুর্মী যুবকের সঙ্গে তার বিবাহের কথা নির্ধারিত ছিল।
রুক্মিনী ও কুর্মী যুবক পরস্পরকে গভীরভাবে ভালোবাসত আগে থেকেই। তাদের ভালোলাগা থেকে ভালোবাসার পর্ব যখন পরিণতির দিকে তখনই ঘটে অঘটন। বিবাহ তিথিতে বিবাহ কার্য শেষ হবার পূর্বে মুসলমানরা এসে অন্যান্য ধন সম্পত্তির সাথে লুঠ করে নিয়ে যায় তাদের। মুসলমানদের অভক্ষ্য শূকর মাংসে এদের প্রীতি আছে শুনে, শেষ পর্যন্ত তারা এদের অস্পৃশ্য জ্ঞানে বর্জন করে। রুক্মিনী ও সেই কুর্মীযুবক যখন গ্রামে ফিরে আসে তখন কুর্মীযুবকের অভিভাবকেরা রুকমিনীর সাথে তার বিবাহে বাধা দেয়। যে মেয়ে মুসলমানকে ছুঁয়েছে, সে মেয়ের সাথে কারোরেই বিয়ে হতে পারে না। কিন্তু এর ফলে তাদের পারস্পরিক প্রেম মোটেই ব্যহত হয়নি। কুর্মী যুবকটি অভিভাবকদের মত পরিবর্তন করতে না পেরে মনের দুঃখে সন্ন্যাসী হয়ে বনে যায়। এদিকে রুক্মিনী অনাহারে অনিদ্রায় দিনাতিপাত করতে থাকে। আর কি করে তার প্রেমাস্পদের সাথে মিলিত হবে এই চিন্তায় মগ্ন থাকে। একদিন সবাই শুনলো টুসুমনি ঘর থেকে নিরুদ্দেশ।
কথাটা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো। রুক্মিনীর ডাক নামটাই বেশি প্রচলিত ছিল দেশে। ফলে বাড়িতে বাড়িতে শুধু টুসুর আলোচনা। ভালোবাসার ধনকে ফিরে পাওয়ার লক্ষ্যে টুসুর গৃহত্যাগের কাহিনি কুমারী মেয়েদের মুখে মুখে ফিরতে লাগল। টুসু তাদের আশ হয়ে উঠলো। অবশেষে একদিন সবাই শুনলো টুসু তার বরকে খুঁজে পেয়েছে সুবর্ণরেখা নদীর তীরে। টুসুর একান্ত ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছে। চারদিক থেকে সবাই ছুটে চললো টুসুকে দেখতে, ইচাগড় থানার সতীঘাটায়। সুবর্ণরেখার একটি ঘাটে তারা দেখতে পেল টুসুকে আর সেই সন্ন্যাসীবেশী বরকে। লোকের আনন্দের অবধি রইল না। কিন্তু এত আনন্দ সইল না। অনাহারে অনিদ্রায় টুসুর স্বাস্থ্য খারাপ হয়েছিল। বাঞ্ছিতকে পাবার পরে তার মৃত্যু ঘটে সেইখানে। বাঞ্ছিতের জন্য টুসুর এই আত্মবিসর্জনকে কুমী বা মাহাতো সম্প্রদায়ের মেয়েরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে আজও স্মরণ করে চলেছে। ইচাগড়ের (বর্তমান সিংভূম) সতীঘাটায় আজও টুসু উৎসব উপলক্ষ্যে বিরাট জনসমাবেশ হয়।
টুসুর মূৰ্ত্তি কোথাও কোথাও দেখা যায় টুসুর মূর্তি। মূর্তিটি লক্ষ্মীর আদলে তৈরি। কখনো প্যাঁচার পিঠে, কখনো প্রস্ফুটিত পদ্মের উপর টুসুর অবস্থান। এক হাতে ঘট অন্য হাতে সন্দেশ, পানখিলি, চাঁদমালা। মানভূমে টুসুকে ধনদাত্রী লক্ষ্মী হিসেবে গণ্য করা হয়। তাই মুর্তিটি সম্পূর্ণ উচ্চবর্ণের দেবী লক্ষ্মীরই প্রতিরূপ।
টুসু পূজার ফুল, নৈবেদ্য, পূজার উপকরণ :
বিভিন্ন মরসুমি ফুল দিয়ে টুসু সাজানে হয়— যেমন বাসক, সরষে, মূলো, জবা, গাঁদা। অর্থাৎ সবই শষ্য সম্পৃক্ত। এই পুজোতে নির্দিষ্ট কোনো নৈবেদ্য থাকে না, তবে তার মধ্যে ছোলাভাজা, জিলিপি, নাড়ু ও বিভিন্ন রকমের পিঠে-পুলি এই পরবের মূল আকর্ষণ।
এই পূজায় যে উপকরণ গুলি থাকে তা হলো— মাটির ঘট বা আলোখলা, গোবর, তুষ, দুর্বাঘাস, তুলসী, চালের গুঁড়ো ও নানা মরসুমি ফুল। টুসু উৎসব মূলত লোকায়ত সমাজে অন্তঃপুরচারিণী মহিলাদের। বিবাহিত-কুমারী — কিশোরী—বৃদ্ধা রমণী এতে অংশগ্রহণ করে। শুধু অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ (ডোম, বাউরী, মাজি, বাগদী) নয়, উচ্চশ্রেণির মানুষেরা টুসুকে কন্যা, দেবী, বন্ধু হিসাবে পূজা করে।
টুসুর পূজা পদ্ধতিঃ
অগ্রহায়ণ মাসের সংক্রান্তির দিন বিকেল বেলাতে মানভূলে গ্রামে-গঞ্জে এই উৎসবের আয়োজন হয়। প্রথমে কারো বাড়ি ঠিক করা হবে যেখানে ‘টুসু’ স্থাপন করা হয়।
সেই বাড়ির দরজায় গোবর জল সহযোগে ছুঁচ দেওয়া হয়। তাতে নানা ধরনের আলপনা দিয়ে সুশোভিত করা হয়। সন্ধ্যার সময় গ্রামের কুমারী মেয়েরা একটি শালপাতার তৈরি থালাতে একটি হরতকিতে সিঁদুর কাজল দিয়ে টুসু সাজিয়ে উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনির সাহায্যে বাড়ির বাহির দরজা থেকে সন্ধ্যাপ্রদীপ ও জলধারাণি সহযোগে বরণ করে ঘরের মধ্যে একটি কলমগাতে তাকে প্রতিষ্ঠা করে। এরপর প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা গ্রামের মেয়েরা সেই বাড়িতে যায়। সেখানে যাওয়ার পর সবাই গোল করে একসাথে বসে টুসুর উদ্দেশ্যে নানারকমের শীতল বা ভোগ অর্পণ করে। তাতে শীতল বা ভোগ হিসেবে থাকে কলাই ভাজা, কইকড়া মুড়ি, ছোলাভাজা। সেই সাথে কেউ কেউ নানা রকমের পিঠা ও মিষ্টান্ন নিয়ে যায়। ভোগ বা শীতল অর্পণ। করার পর শুরু হয় টুসু বিষয়ক নানা ধরনের গান। তবে মাসের প্রথমদিকে মূলত টুসুর আগমনের গীতগুলি গাওয়া হয়।
- টুসু গান বাংলা
- টুসু পরব কোন অঞ্চলের কোন জনগোষ্ঠীর বড় উৎসব
- টুসু গান Lyrics
- টুসু ছড়া
- আদিবাসী টুসু গান
- টুসু গীত
- মকর সংক্রান্তি টুসু গান
- পুরুলিয়া টুসু গান