অতীতের মহাসমাবেশ ও সামনের ঐতিহাসিক হুলহুলি মহাঅধিবেশন হতে চলেছে :
দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর পর কুড়মি জনজাতির ঐতিহাসিক মহাঅধিবেশন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে পুরুলিয়া জেলার হুলহুলি ( ছড়রা এরোড্রাম) মাঠে। এই মহাসমাবেশ কে সাফল্যমণ্ডিত করে তোলার জন্য সাজো সাজো রব চলছে পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদনিপুর, দিনাজপুর, আলিপুরদুয়ার জেলা সহ আসাম, ঝাড়খন্ড, ওড়িশা বিভিন্ন রাজ্যে। ইতিপূর্বে এইধরনের মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৯ সালে ঝুঝকা এবং ২০১৫ সালে পুরুলিয়া জেলার ডুড়কুতে। বিগত সম্মেলনের পর গত দশবছরে আমরা কি পেয়েছি, কি পাইনি , সম্মেলনে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো কতটা আমরা সমাজজীবনে কার্যকর করতে পেরেছি সে বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করার চেষ্টা করবো।
নেগাচার :
বিগত সম্মেলনে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর অন্যতম ছিল সামাজিক নেগ - নীতি - নেগাচার বিষয়ে ধ্যান দেওয়া। পিছন ফিরে তাকালে দেখতে পাব এই বিষয়ে আমরা অনেকটা সফল । বিগত দশ বছরে গ্রামে গ্রামে পাড়ায় পাড়ায় সামাজিক নিয়মে বিয়েবাড়ি, শ্রদ্ধা অনুষ্ঠান করার ঢল নেমেছে। বিভিন্ন জেলায় প্রচুর মানুষ সামাজিক এইসমস্ত কাজকর্ম করার জন্য এগিয়ে এসেছেন। বিগত সম্মেলনের পর থেকেই কুড়মালি ভাষায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানের চিঠিপত্র ছাপানোর কাজ শুরু হয়েছে। অবশ্য এবিষয়ে আত্মসন্তুষ্টির কোনো জায়গা নেই; এখনও অনেক পথ এগিয়ে যেতে হবে।
ভাষা ও সাহিত্য :
কথায় আছে - যে জাতির ভাষা নেই , সে জাতির দিশা নেই । বিগত দশ বছরে যদি কোনো বিষয়ের সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়ে থাকে সেটা অবশ্যই 'ভাষা '। সামাজিক আন্দোলনের চাপে এবং বিধানসভায় তৎকালীন বিধায়ক শ্রী নেপাল মাহাত মহাশয়ের নিরন্তর প্রয়াসের ফলে ২০১৮ সালে কুড়মালি ভাষা পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় রাজভাষার মর্যাদা পায়। এই সময়কালের মধ্যেই পুরুলিয়া জেলার সিধু কানু বিশ্ববিদ্যালয় ও ঝাড়গ্রাম জেলার সাধু রামচাঁদ মুর্মু বিশ্ববিদ্যালয়ে কুড়মালি বিষয়ে পঠনপাঠন শুরু হয়। এছাড়াও বিভিন্ন কলেজে পাশ ও অনার্স কোর্সে কুড়মালি বিষয়ে পঠনপাঠন চলছে। এ বিষয়ে সিধু কানহু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড: সনত কুমার মাহাত মহাশয়ের ভূমিকা প্রশ্নাতীত।
আশারাখি আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত কুড়মালি ভাষায় পড়াশুনা শুরু হয়ে যাবে।
এই সময়কালের মধ্যেই কুড়মালি ভাষায় রচিত হয়েছে একাধিক কাব্যগ্রন্থ, কবিতার বই, গল্পগুচ্ছ । সম্প্রতি একটি সাপ্তাহিক ও একটি পাক্ষিক সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছে কুড়মালি ভাষায়। তাই এই সময়কালকে কুড়মালি ভাষার সুবর্ণযুগ বলা চলে।
সংস্কৃতি :
কুড়মি জনজাতি প্রাচীনকাল থেকেই নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষা করে আসছে। করম - মকর - বান্দনা - টুসু - ছৌ - ঝুমৈর নিয়ে রিঝেরঙ্গে জীবন কাটানো তাদের চিরাচরিত অভ্যাস। কিন্তু সভ্যতার অগ্রগতির সাথেসাথে মূল ভাবধারা বজায় রেখে প্রত্যেক জিনিসে মোডিফিকেশন আনা জরুরি ; নতুবা সেটা কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল । বিগত দশবছরে এবিষয়ে অনেকটা অগ্রগতি ঘটেছে।
চলতি সময়ে আর্থিক মন্দার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য টুসু নাচ, করম নাচের দলগুলোকে বিভিন্ন জায়গায় আর্থিকভাবে সাহায্য করা হয়। ইদানিং মকর পরবে টুসুগীত, বান্দনা পরবে অহিরা গীত, করম পরবে করমগীত প্রতিযোগিতা করা হয় অনলাইন ও অফলাইন বিভিন্নভাবে। এছাড়াও বিভিন্ন পার্বণের সময় পিঠা করা প্রতিযোগিতা, চোখপুরা আঁকা প্রতিযোগিতা করা হয়। এসব কাজে এগিয়ে এসেছেন একঝাঁক তরুণ তরুণী। তাছাড়া বর্তমানে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে যেভাবে টুসু পরব , করম পরব পালন করা হচ্ছে সেটা দেখে বলতেই হয় আমাদের সাংস্কৃতিক ভবিষ্যত উত্তরাধিকারীদের হাতে যথেষ্ট সুরক্ষিত।
স্বাধীনতার ইতিহাস উদ্ধারকার্য :
ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এক উল্লেখ্যযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল কুড়মি জনজাতির মানুষেরা। ব্রিটিশ ঐতিহাসিকরা এ বিষয়ে তাঁদের বইয়ে জায়গা দিলেও কোনো বাঙালি ইতিহাসবিদ তাদের বইতে জায়গা দেননি। বিগত দশবছরে আমরা এইকাজে অনেকটা সফল হয়েছি।
চুয়াড় বিদ্রোহের মহানায়ক শহীদ রঘুনাথ মাহাত' র নামাঙ্কিত সেতু ( লালগড় ) উদ্বোধন করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এছাড়াও খাতড়া, লালগড়, পুরুলিয়াসহ্ একাধিক জায়গায় রঘুনাথ মাহাত ' র মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে।
তৎকালীন মহামহিম রাষ্ট্রপতি শ্রী প্রণব মুখার্জি পুরুলিয়া বাসস্ট্যান্ডের নামকরণ করেন গোকুল - গণেশ - চুনারাম - গোবিন্দ মাহাত বাসস্ট্যান্ড। সরকারি উদ্যোগে মানবাজার থানার সামনে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের শহীদ চুনারাম - গোবিন্দ মাহাত 'র মূর্তি বসানো হয়েছে। ঐদিনই কুমারী নদীর উপর সেতুর নামকরণ করা হয়েছে চুনারাম - গোবিন্দ সেতু। এছাড়াও ঝালদাতে পাঁচ শহীদের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে।
শুশুনীয়া সরকারি কলেজের নামকরণ করা হয়েছে চুনারাম - গোবিন্দ মেমোরিয়াল কলেজ।
কুড়মি ডেভলপমেন্ট বোর্ড :
সামাজিক আন্দোলনের চাপেই সরকারিভাবে কুড়মি জনজাতির মানুষজনের জন্য গঠন করা হয়েছে কুড়মি ডেভেলপমেন্ট ও কালচারাল বোর্ড। এছাড়াও এইসময়কালের মধ্যেই গঠন করা হয়েছে মানভূম কালচারাল একাডেমী। যদিও এই বোর্ড কতখানি মানুষের ডেভেলপ করেছে তার বিচার জনগন করবে। প্রাথমিক পর্যায়ে বোর্ডের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ ছিল ১০ কোটি। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকার আরো ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন। প্রতিটি জেলায় কুড়মি ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের নিজস্ব অফিস ঘর তৈরি করা হয়েছে।
হুল হুলিতে অধিবেশন কবে হবে ?
৮, ৯ ও ১০ই মার্চ ২০২৪ হুলহুলি যেতে বলেছে প্রত্যেকে যাওয়ার বিশেষ ঘোষণা করা হয়েছে এবং সেদিনই ডুড়কু অধিবেশন শুরু করা হবে । প্রতিটি মাহাত সম্প্রদায়ের মানুষদের এখানে যাওয়া আবশ্যক বলে জানিয়েছেন মাহাতো সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।


