Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit. Test link

Search Suggest

পুরুলিয়ার নারী লোকনৃত্য: নাচনী, খেমটা, ভাদু ও সাঁওতালী নাচের ইতিহাস

মানভূমের নারী লোকনৃত্য, পুরুলিয়ার লোকনৃত্য, মানভূমের লোকসংস্কৃতি, নাচনী নাচ, ধুমড়ী নাচ, খেমটা নাচ, ভাদু নাচ, সাঁওতালী নৃত্য, করম নাচ, বাহা নাচ,

 মানভূমের নারী লোকনৃত্যের ইতিহাস, নাচনী, ধুমড়ী, খেমটা, ভাদু ও সাঁওতালী নাচের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সংগ্রামের বিস্তারিত আলোচনা।

মানভূমের নারী লোকনৃত্য : ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সংগ্রামের এক জীবন্ত ইতিহাস



মানভূম আজ আর প্রশাসনিক মানচিত্রে নেই, কিন্তু মানভূমের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আবেগ এখনও লক্ষ মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত। ১৯৫৬ সালের ১লা নভেম্বর ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের ফলে মানভূম জেলার অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়। জেলার ১৬টি থানা পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয়ে বর্তমান পুরুলিয়া জেলার অংশ হয় এবং অবশিষ্ট এলাকা বর্তমানে ঝাড়খন্ড রাজ্যের অন্তর্গত। প্রশাসনিক বিভাজন হলেও মানভূমের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, লোকসংগীত ও লোকনৃত্যের ঐতিহ্য আজও দুই বাংলার মানুষের সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে অম্লান।

মানভূমের সংস্কৃতি মূলত লোকসংস্কৃতিনির্ভর। এখানকার মানুষের জীবনের সঙ্গে গান, নাচ ও উৎসব ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। একটি প্রচলিত প্রবাদ আজও মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়—

"নাচা বাজা বেশ, মানভূঁইয়ার দেশ।"

এই প্রবাদ থেকেই বোঝা যায়, মানভূমের মানুষ নৃত্যপ্রিয়। আর এই লোকনৃত্যের ধারাকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে নারীদের অবদান অপরিসীম। নারীকে বাদ দিয়ে মানভূমের লোকনৃত্যের ইতিহাস কল্পনাই করা যায় না। সংসারের দায়িত্ব পালন করতে করতেই তারা লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করে চলেছেন এই ঐতিহ্য।

লোকনৃত্য ও নারীর ভূমিকা

মানভূমের গ্রামীণ সমাজে নারী শুধুমাত্র সংসারের দায়িত্বই পালন করেননি, তিনি ছিলেন সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। মাঠে-ঘাটে কাজ, পারিবারিক দায়িত্ব, উৎসব-পার্বণ—সব কিছুর মধ্যেও নারী লোকগান গেয়েছেন, নেচেছেন এবং লোকঐতিহ্যকে জীবিত রেখেছেন। কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত পঙ্‌ক্তি এখানে স্মরণীয়—

> "বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।"

মানভূমের নারী লোকনৃত্যের ক্ষেত্রেও এই কথার যথার্থতা স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

খেমচী বা খেমটা নাচ

খেমচী নাচ, যা খেমটা নাচ নামেও পরিচিত, সম্পূর্ণ মেয়েলি লোকনৃত্য। সাধারণত একজন নারী সেজেগুজে এককভাবে এই নৃত্য পরিবেশন করেন। তিনি নিজেই গান করেন এবং সেই গানের তালে নৃত্য করেন। খেমটা গানের বিষয়বস্তু সাধারণ মানুষের প্রেম, বিরহ, হাস্যরস ও সামাজিক জীবন। অনেক সময় গানগুলিতে দ্ব্যর্থক শব্দ বা রসিকতার ছোঁয়াও দেখা যায়।

খেমটা নাচের একটি জনপ্রিয় গান—

পরাপিরীত এমন ল্যাতা,
যেমন শিয়ালের কাঁটা।
ছাড়লে না ছাড়ে যেটা,
বিঁধেছে হিয়ায়।
প্রাণ যায় যায় গো প্রাণ যায় যায়।

এই ধরনের গান ও নৃত্যের মধ্য দিয়ে গ্রামীণ জীবনের আবেগ ও অনুভূতি প্রকাশ পায়।

ভাদু নাচ

ভাদু নাচ ও ভাদু গানের উৎসভূমি পঞ্চকোট রাজ্যের কাশীপুর রাজবাড়ি। ভাদ্রমাস জুড়ে ভাদু উৎসব পালিত হয়। ভাদু দেবীর প্রতিমার সামনে গ্রামের মেয়েরা একত্রিত হয়ে ভাদু গান করেন। অনেক ক্ষেত্রে গান গাওয়ার সময় নৃত্যও পরিবেশিত হয়। কাশীপুর রাজবাড়ির পুরোনো তথ্য থেকে জানা যায় যে অতীতে ভাদুর জাগরণ উপলক্ষে কিছু পুরুষ মহিলা সেজে নৃত্য পরিবেশন করতেন। ভাদু নাচ কেবল বিনোদন নয়, এটি গ্রামীণ নারীদের সামাজিক মিলনক্ষেত্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আজও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে ভাদু উৎসবের মাধ্যমে এই ঐতিহ্য বেঁচে আছে।

নাচনী নাচ :   

সংগ্রাম ও শিল্পের কাহিনি মানভূমের সবচেয়ে পরিচিত নারী লোকনৃত্যের নাম নাচনী নাচ। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঝুমুর গান, মাদলের তালে তালে নাচ এবং এক দীর্ঘ সামাজিক ইতিহাস। নাচনী নাচে একজন নারী শিল্পীকে "নাচনী" এবং যিনি তাকে পরিচালনা করেন তাকে "রসিক" বলা হয়। ঢাক, ঢোল, মাদল ও বাঁশির সুরে নাচনী নাচ পরিবেশিত হয়। নাচনীদের জীবন সহজ ছিল না। সামাজিক অবহেলা, দারিদ্র্য ও নানা কুসংস্কারের মধ্যেও তারা এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

পুরুলিয়ার কিংবদন্তি নাচনী শিল্পী সিন্ধুবালা দেবী এই শিল্পধারাকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করে তুলেছিলেন।

ঝুমুর গানের একটি অংশ—

> "ঝাড়হাঁয়ের বনে ঝাড়ে ভালোবাসা আছে, মনের ময়ুর নাচে পুরুলিয়ার পীরিতে।"

এই গানগুলির মধ্য দিয়ে প্রেম, প্রকৃতি ও মানুষের জীবনচিত্র ফুটে ওঠে।

ধুমড়ী নাচ 

ধুমড়ী নাচ পুরুলিয়ার গ্রামীণ সমাজে প্রচলিত একটি প্রাচীন লোকনৃত্য। সাধারণত বিবাহ অনুষ্ঠান বা গ্রামীণ মেলায় এই নৃত্য পরিবেশিত হতো। একজন নারী শিল্পী এবং কয়েকজন বাদ্যযন্ত্রী নিয়ে এই নৃত্যের দল গঠিত হয়। ঢোল, বাঁশি ও মাদলের সুরে ঝুমুরধর্মী গান পরিবেশন করা হয়। যদিও আধুনিক সময়ে এই নাচের প্রচলন অনেক কমে গেছে, তবুও এটি মানভূমের লোকঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাঈ নাচ বাঈ নাচ মূলত নাচনী নাচেরই একটি মঞ্চভিত্তিক রূপ। বৃহৎ দর্শকসমাগমের সামনে এই নৃত্য পরিবেশিত হয়। একসময় গ্রামীণ মেলা, উৎসব ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাঈ নাচ ছিল প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু বর্তমানে এই নৃত্য প্রায় বিলুপ্তির পথে।

সাঁওতালী নারী লোকনৃত্য

মানভূমের লোকসংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল সাঁওতালী সমাজের নৃত্যধারা। সাঁওতাল নারীদের বিভিন্ন উৎসব ও পার্বণে নাচের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।

দং নাচ

দং নাচ সাধারণত বিবাহ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। ১৫-২০ জন নারী বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে একে অপরের হাত ধরে নৃত্য করেন। নাচের সঙ্গে গানও গাওয়া হয়। সাঁওতাল সমাজে প্রচলিত বহু গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ দং নাচের সঙ্গে সম্পর্কিত।

করম নাচ

ভাদ্রমাসে করম উৎসব উপলক্ষে করম নাচ অনুষ্ঠিত হয়। কুমারী মেয়েরা জাওয়া ডালিকে কেন্দ্র করে দলবদ্ধভাবে নাচ করেন। এই নাচ উর্বরতা, কৃষি ও নতুন জীবনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

ধান রোপণ, ধান কাটা, মাছ ধরা প্রভৃতি দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করম নাচে ফুটে ওঠে।

---

লাগড়ে নাচ

লাগড়ে নাচে নারীরা হাতে হাত রেখে অর্ধবৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে নৃত্য করেন। এই নৃত্যের গানে আদিবাসী জীবনের ইতিহাস, প্রকৃতি, সমাজ ও সংস্কৃতির নানা দিক উঠে আসে। সাঁওতালদের প্রায় সব উৎসবেই লাগড়ে নাচ দেখা যায়।

পাতা নাচ

পাতা নাচ সাধারণত মেলা ও বিভিন্ন লোকউৎসবে পরিবেশিত হয়। আঞ্চলিক ভাষার পাতা গানের তালে এই নৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। দলগতভাবে পরিবেশিত এই নৃত্য দর্শকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

---

ঝিকা নাচ

ঝিকা নাচে মেয়েরা অর্ধবৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে নৃত্য করেন এবং পুরুষরা বাদ্যযন্ত্র বাজান। দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম, আশা ও সংগ্রামের কথা এই নাচের গানে ফুটে ওঠে।

ডাহার নাচ

ডাহার নাচে কুমারী মেয়েরাই অংশগ্রহণ করেন। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে পুরোহিতকে কেন্দ্র করে এই নাচ পরিবেশিত হয়।

---

বাহা নাচ

সাঁওতাল সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব হল বাহা পরব। "বাহা" শব্দের অর্থ ফুল। বসন্ত ঋতুতে অনুষ্ঠিত এই উৎসবে মেয়েরা গান করেন এবং দলবদ্ধভাবে নৃত্য পরিবেশন করেন। প্রকৃতি, ফুল, নতুন জীবন এবং দেবী জাহেরের আরাধনা—সবকিছু মিলিয়ে বাহা নাচ সাঁওতাল সংস্কৃতির অন্যতম সুন্দর প্রকাশ।

আধুনিকতার প্রভাব ও সংকট

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক লোকনৃত্য হারিয়ে যেতে শুরু করেছে। যৌনাচ, বুলবুলি নাচ, সখী নাচের মতো বহু প্রাচীন নৃত্য আজ প্রায় বিলুপ্ত। গ্রামের নতুন প্রজন্মের অনেকেই আধুনিক বিনোদনের দিকে ঝুঁকে পড়ায় লোকসংস্কৃতির চর্চা কমে যাচ্ছে। ফলে বহু শিল্পী তাদের শিল্পচর্চা চালিয়ে যেতে পারছেন না। সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয় হল, সমাজ এখনও অনেক ক্ষেত্রেই এই নারী শিল্পীদের যথাযথ সম্মান দিতে পারে না। অথচ তারাই যুগের পর যুগ ধরে মানভূমের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

মানভূমের নারী লোকনৃত্য কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি একটি সমাজের ইতিহাস, সংস্কৃতি, আবেগ এবং সংগ্রামের দলিল। খেমটা, ভাদু, নাচনী, ধুমড়ী কিংবা সাঁওতালী দং, করম, বাহা—প্রতিটি নৃত্যই এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। যতদিন মানভূমের মানুষ তাদের শিকড়কে মনে রাখবে, ততদিন এই লোকনৃত্য ও লোকসংস্কৃতি বেঁচে থাকবে। কারণ সংস্কৃতি হারিয়ে গেলে পরিচয় হারিয়ে যায়।

একটি প্রাচীন লোকগানের পঙ্‌ক্তি দিয়ে শেষ করা যাক—

> "ভালে কইর‍্যা বাজায়ো দোতারা, সুন্দরী কমলা নাচেরে।"

মানভূমের নারী লোকনৃত্য শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, এটি আগামী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণযোগ্য এক অমূল্য সাংস্কৃতিক সম্পদ।



Post a Comment